
স্মৃতি হাতড়ে দেখতে পাই, শিখা-শেখানোর চারটি বছর কেটে গেছে
দেখতে দেখতেই যেন সময় চলে যায়। সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে আমি ক্লাস নিচ্ছি, আজ ৪ বছর হয়ে গেলো! ১২ সেমিস্টার টানা ক্লাস নিয়েছি! সময় কত দ্রুত চলে যায়। ফল-২০১৬, এই তো সেদিন মনে হয়, যখন আমি ক্লাস নেয়া শুরু করলাম সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে। ইঞ্জিনিয়ারিং ইথিক্স দিয়ে শুরু করে ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা স্ট্রাকচার, ডেটাবেজ ডিজাইন, প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ (সি), কতগুলো সাবজেক্ট পড়ানো হয়ে গেছে এই ১২ সেমিস্টারে! যেদিন আমি খন্ডকালীণ শিক্ষক হিসেবে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে পা রেখে ছিলাম, সেদিন যারা ভর্তি হয়ে প্রথম ক্লাসে এসেছিলো, আজ তারা গ্র্যাজুয়েট!
সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা নিয়ে আমার আরও কয়েকটি লেখাঃ
- লেকচারার হিসেবে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে || ফল ২০১৬
- শিক্ষকতার ২ বছর!
- জীবনের প্রথম বাইসাইকেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ
কখনও চিন্তাও করিনি টানা ১২ সেমিস্টার এভাবে ক্লাস নিতে পারবো। আমি একজন ফুলটাইম সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। পাশাপাশি আমার শেখা বিষয়বস্তু ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার ইচ্ছা অটুট থাকায় একমাত্র এটা সম্ভব হয়েছে। আরেকটা কারণে সম্ভব হয়েছে, সেটা হলো সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি নিজে। শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ, স্টাফ, ছাত্রছাত্রী সবার ভালোবাসা আরও অটুট বন্ধনে আটকে রেখেছিলো আমায়, এই চারটি বছর। আমার এখনও মনে পরে, চার বছর আগে তমাল স্যারের কাছে প্রশ্নের টেমপ্লেট খুজছিলাম ল্যাটেকের, আমি আজও সেই টেমপ্লেট দিয়েই প্রশ্ন করি ছাত্রছাত্রীদের জন্য।

শাহরিয়ার স্যারের (চেয়ারম্যান, সিএসই, এসইইউ) সাথে আমার পুরো সেমিস্টারে সর্বোচ্চ এক থেকে দুইবার দেখা হতো, তাও কোন না কোন স্বাক্ষর বিষয়ক ব্যাপারে। স্যারের সামনে যাওয়ার পর্যাপ্ত কারণ আমি যোগাড় করতে না পারার কারণে স্যারের সামনে যাওয়ার সুযোগ হতো আরও কম। তমাল স্যার সহ বাকি স্যার ম্যাডামদের রুমে উঁকিঝুঁকি, গল্প-আড্ডা তো হর হামেসাই হতো। বিশেষ করে মাহবুব স্যার, রাজন স্যার, রাকিব স্যার, আশিক স্যারদের রুমে বিনা অনুমতিতেই চলে গিয়েছি কত। জলি ম্যাডামের হাতের বানানো কফি খাওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনেও ছিল বেশ আনন্দ। কো-অর্ডিনেটরদের কথা যদি বলি, আমি যখন ক্লাস নেয়া শুরু করি তখন তমাল স্যার কো-অর্ডিনেটর ছিলেন, তারপর রাজন স্যার, সিফাত স্যার এবং আশরাফ স্যারের কাছ থেকে আমি অনেক অনেক সহযোগিতা পেয়েছি, দিন-রাত সব সময় জ্বালিয়েছি উনাদের সবাইকে।

উনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আসলে শেষ করা যাবেনা। প্রোগ্রাম অফিসের সাঈদ ভাই, সুইটি ম্যাডাম উনারাও প্রচুর সহযোগিতা করেছেন, সাথে অফিস স্টাফ আলী ভাই, জাহিদ ভাই, ইয়াসিন ভাই সহ ল্যাব এসিস্ট্যান্টরা। আর সবচাইতে বেশী যারা আমায় সহযোগিতা করেছে, তারা হচ্ছে আমার ছাত্রছাত্রীরা। ক্লাস সকাল সাড়ে আট টায় হোক কিংবা শুক্রবার দুপুর আড়াইটায়, আশি-নব্বই শতাংশ ছাত্রছাত্রী আমার ক্লাসে উপস্থিত থাকতো এবং এখনও থাকে, সেই ২০১৬ সাল থেকে।
প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করে ইন্টারেক্টিভ ক্লাসরুম তৈরী করে রাখতে সহযোগিতা করেছে আমাকে। আর ভালোবাসার উদাহরণস্বরূপ বেশ কয়েক সেমিস্টারে আমাকে এতো বেশী বেশী নম্বর দিয়েছে টিচিং ইভালুয়েশনে, যে পুরো সিএসই ডিপার্ট্মেন্টের সকল শিক্ষক-শিক্ষিকাদের চেয়ে আমাকে বেশী নম্বর দিয়েছে। যেখানে, পুরো ডিপার্ট্মেন্টে আমি সবচেয়ে ছোট্ট মানুষ। যদিও বিষয়টি আমার একদমই জানা ছিলোনা, ভালোবাসা বহিঃপ্রকাশে শাহরিয়ার স্যার ও তমাল স্যারের ভিন্ন সময়ে ফেসবুক কমেন্ট ও ক্যাপশনের দ্বারা আমি তা অবগত হই।

ছাত্রছাত্রীদের এতো এতো ভালোবাসা আমাকে শত ব্যাস্ততার মাঝেও সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নিতে আসার জন্য আগ্রহী করে রাখে। এই বছর করোনাকালীন সময়েও ছাত্রছাত্রীরা যেভাবে ক্লাস নেয়ার বিষয়ে সহযোগিতা করেছে, তা আসলে ব্যাখা করার মতো নয়। এ নিয়ে লেখা আমার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস হুবুহু তুলে ধরছি – “কোভিড-১৯ এর সংক্রমন কমাতে বন্ধ হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, পরে মার্চ মাসেই সিদ্ধান্ত এলো অনলাইনে ক্লাস হবে। বিষয়টা অনেকের কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হলেও অনেকের কাছে ঠিক তার উল্টো। যদিও ব্যাতিক্রম আমাদের সবারই ভালো লাগে, কিন্তু ব্যাতিক্রম কাজটা অন্য কেউ করে দিলে দেখতে ভালো লাগে, নিজে করতে গেলে ভালো নাও লাগতে পারে। আসলে অফলাইন আর অনলাইন ক্লাসের এক্সপেরিয়েন্স ভিন্ন হবে এটাই স্বাভাবিক। সবই ঠিক আছে কিন্তু বিপত্তি বাধলো অনলাইন ক্লাসের ‘অনলাইন’ বিষয়টা নিয়েই। ইন্টারনেট, নেটওয়ার্ক, ডিভাইস, ইলেক্ট্রিসিটি সবগুলোতেই সমস্যা থাকার সম্ভাবনা আছে ছাত্রছাত্রীদের, তাহলে ক্লাস কিভাবে নিবো! অফলাইন ক্লাস হলে তো ল্যাবে গিয়ে সরাসরি পড়িয়ে আসা যায়, কিন্তু এখন?

ইউনিভার্সিটি থেকে বেশ কিছু সাজেশন এলো, এখন সেগুলো নিয়ে চিন্তা করে কোর্স লেকচার কিভাবে ডেলিভার করবো সেটা ভাবার পালা। এমন ভাবে পড়াতে হবে, যেন উপরের সবগুলো মৌলিক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও ছাত্রছাত্রীরা লেকচার কভার করতে পারে। তাই চিন্তা করলাম পড়ানোর কন্টেন্টটা আলাদা ভিডিও লেকচার হিসেবে বানাবো, সেখানে কাগজে কলমে কিভাবে পড়া যাবে কম্পিউটার ব্যাবহার না করে সেই মেথড থাকবে, পাশাপাশি কম্পিউটারেও কিভাবে পড়া যায় সেটাও থাকবে। ভিডিও লেকচারটি রাখবো ইউটিউবে, তাহলে লো রেজুলেশন এবং লো ব্যান্ডউইথেও দেখা যাবে। আর ভিডিওটি ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই আপলোড করে দিবো। ছাত্রছাত্রীরা চাইলে আগেই পুরো পড়াটি দেখে নিতে পারবে। এরপর শিডিউল ক্লাস টাইমে লাইভে থাকবো, তাও ইউটিউবে (উপরোক্ত কারণে) এবং যে যেই অংশতে সমস্যা মনে করে অথবা পুনরায় বুঝিয়ে দিবো। লাইভের কমেন্টেবক্সে, শর্ট কমেন্টেই সকল সমস্যা ছাত্রছাত্রীরা আমার কাছে নিয়ে আসতে পারবে।

সবকিছুই ভাবলাম কিন্তু বাস্তবে রূপ দিতে হবে তো! ভিডিও লেকচার বানাবো চিন্তা করলাম কিন্তু কিভাবে? একটা ওয়াকম থাকলে ভালো হতো, অথবা হোয়াইট বোর্ড, ঐদিকে ওয়েব ক্যাম নাই একটাও, দুইটা ক্যাম আছে ১২ বছর আগের ওগুলো এখন আর সাপোর্ট করেনা। একটা ল্যাপটপের ওয়েব ক্যাম আছে বাসায়, ভাবলাম এটা দিয়েই করবো ভিডিও লেকচার। ওয়েব ক্যামের কারণ, কে কথা বলতেছে তাকে না দেখলে লেকচার অনেক সময় ইন্টারেস্টিং লাগেনা। ল্যাপটপের স্ক্রিণ রেকর্ড করবো ভাবলাম Kazam দিয়ে। মাইক্রোফোন নাই, তাই ইয়ারফোনের মাইক-ই ভরসা। যেহেতু ওয়াকম অথবা হোয়াইট বোর্ড নাই তাই ভাবলাম স্ক্রীণ স্কেচিং কোন টুল ব্যাবহার করবো, তাই ব্যাবহার করলাম Pylote। ওয়েব ক্যাম আবার স্ক্রিনে দেখানোর জন্য ব্যাবহার করলাম guvcview। এভাবে বহু চরাই-উতরাই পার হয়ে ভিডিও লেকচারের রেকর্ডিং শুরু হলো, কখনো রেকর্ড করে দেখি সাউন্ড ঠিক আসে নাই, আরও নানা ঝামেলা। রেকর্ডিং-এর পরে এবার আসলো, মাল্টিপল ক্লিপ মার্জ এবং ট্রিম করা নিয়ে বিপত্তি। পরে তাও সমাধান করলাম Adobe Premier Pro দিয়ে। ভিডিও লেকচার বানানো হলো, সেগুলো ইউটিউবে আপলোডও দিলাম। একটা অংশ চুকে গেলো, এবার শিডিউলড ক্লাসে লাইভে থাকতে হবে ইউটিউবে একরই রকম সেটাপ নিয়ে৷ একই সেটাপ বলতে, লাইভে আমার এই স্ক্রিনও দেখতে হবে, স্কেচও করতে পারতে হবে, ওয়েব ক্যামে আমাকে দেখাও যেতে হবে ইত্যাদি। তাই OBS (Open Broadcaster Software) ব্যাবহার করলাম স্ট্রীমের জন্য। এভাবেই চললো এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ।

আমি কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগেই পড়াই এবং এবার কোর্সও ছিলো প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজের থিউরি। তাও আমাকে কতো কিছু ভাবতে হয়েছে। আমি শুধু অন্য শিক্ষকদের কথা ভেবেছি প্রতি মুহূর্ত। তাদের না জানি কি অবস্থা! অবশ্য আমাদের পুরো কষ্টটাই ছাত্রছাত্রীদের জন্য, তাদের যেন কাজে আসে। এতো কঠিন পরিস্থিতেও ছাত্রছাত্রীরা লেকচার কভার করেছে, এসাইনমেন্ট দিয়েছে, তাদের জন্য এইটুকু করাই যায়। যেহেতু আমি ফুল টাইম সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং পার্ট-টাইম লেকচারার তাই আমাকে এতো কিছু করার জন্য সময় বের করতে ভালোই বেগ পেতে হয়েছে। সময়ও গিয়েছে বেশ ভালোই।”

সবার এতো এতো সহযোগিতা এবং ভালোবাসা না থাকলে এতোটা পথ পেরিয়ে আসা সম্ভব হতোনা। মাহবুব স্যারকে আমি সবসময় বড় ভাই হিসেবে পেয়েছি, আড্ডা হোক সেটা টেকনোলজি কিংবা এমনি, খাওয়া-দাওয়া, ঘোরাঘুরি সব কিছুতেই ভাইকে পেয়েছি বন্ধুর মতো। নিজের স্কুল বান্ধুবী কিমিয়াকে পেয়েছি সহকর্মী হিসেবে। একে তো আমি সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছি, তার উপর এখানেই চার বছর শিক্ষকতা, সব মিলিয়ে পুরো সময়টাই দারুণ কেটেছে।
সব মিলিয়ে বলতে চাই, ফুলটাইম চাকুরী করে সাউথইস্টে পড়ানো আবার পাশাপাশি মাস্টার্স করা মোটেও সহজ কাজ ছিলোনা আমার জন্য। তবে ইচ্ছাশক্তি, দৃঢ় মনোবল এবং সবার সহযোগিতা আমাকে এতোটা পথ এগিয়ে নিয়ে এসেছে।
অনেক অনেক ভালোবাসা সবার জন্য।

































