ছুটি পাবো পাবো বলে আগে থেকেই একটা সম্ভাবনা ছিল। কোথাও এবার যেতেই হবে। গত বছর সেপ্টেম্বরে ইন্ডিয়া ঘুরে আসার পরে আর কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয়নি। ছুটি মিলেছে বেশ কয়েকবার কিন্তু কোথাও যাওয়ার সুযোগ আর করে উঠতে পারিনি। তাই এবার কোথাও না কোথাও যাবো এই সংকল্পে বাঁধা ছিলাম।
একটু বড় ছুটি পেলে পাহাড়ি এলাকা কোথাও বেড়াতে যাবো এটা বেশ অনেক আগের চিন্তা ভাবনা। এবার অফিস থেকে ছুটি মিললো আট দিন! টুক টুক করে গড়ে তোলা হলো ট্রাভেল টীম। যাদের সাথে নিঝুম দ্বীপ ঘুরে এসেছি তারাই সঙ্গী, কিছু রথবদল হয়েছে আর হয়ে সংযোজন। শেষমেষ এগারো জনের দল নিয়ে ৩০শে এপ্রিল রাত ৯টা ৪৫মিনিটের বাসে করে যাত্রার চিন্তাভাবনা নিয়েই এবারে ভ্রমন শুরু।

৩০শে এপ্রিলঃ রাত ৯টা ৪৫মিনিটের বাস, ঈগল পরিবহন, কলাবাগান কাউন্টার। সবাই শার্প ৯টায় চলে এসেছি কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই। একটু ভয় ছিল বৃষ্টি নিয়ে, ঢাকা ব্যাপক বৃষ্টি হচ্ছে। সকালে-বিকালেও বৃষ্টি ছিল আজ। ভাবনা একটাই ছিল ঘুরতে গিয়ে আবার বৃষ্টি পাই কিনা। যাইহোক, বাসে উঠা পর্যন্ত কোন সমস্যা হয়নি। সাথে রেইনকোট সহ পর্যাপ্ত পলিথিন নিয়ে নিয়েছি সবাই। শুরু হলো যাত্রা, গন্তব্য খাগড়াছড়ি। এখন মাথায় চিন্তা ঘুরছে, রাস্তা জ্যাম কেমন পরবে। গত কয়েকদিনের আপডেট থেকে জানলাম ব্যাপক জ্যাম রাস্তায়। কোন প্রকার জ্যাম ছাড়াই কুমিল্লা পর্যন্ত চলে এসেছি, ভেবেছিলাম মেঘনায় জ্যাম হবে কিন্তু কিছুই ছিলোনা। কমবেশী সবাই বাসা থেকে ভাত খেয়ে আসা সত্ত্বেও পরোটা খেয়ে নিলাম ভাজি দিয়ে। আবার যাত্রা শুরু। কিসের বৃষ্টির ভয়! জোছনা দেখছি বাসে জানালা দিকে। আকাশ একদম পরিষ্কার। এবার গিয়ে পরলাম আসল জ্যামে। ফেনী! ৩ ঘন্টা জ্যামের সাথে যুদ্ধ করে তবেই পার হলাম ফেনী।
১লা মেঃ যখন আলো ফুটতে শুরু করলো তখনি দেখা মেলা শুরু হলো পাহাড়ের। দুইপাশে পাহাড় আর তার মাঝ দিয়ে চকচকে পিচঢালাই করা রাস্তা। আঁকাবাঁকা, কখনও উপরের দিকে উঠছি তো কখনও নিচের দিকে নামছি। সকাল ৭টা ৩০ মিনিটের দিকে এসে পৌছলাম খাগড়াছড়ি। বাস থেকে নেমে দেখি আকাশ চকচক করছে রোঁদে, ঢাকায় কি দেখে আসলাম আর এখানে কি! নেমেই আগে সবাই খেলাম ডাবের পানি।

চান্দের গাড়ি আগেই বুক করে রেখেছি। বুক না করে আসলেও বুক করা যায়। চান্দের গাড়ি!! নাম শুনলেই মনে চান্দে চলে যেই গাড়ি। আসলে মহিন্দ্র বুলেরো, টাটা ইয়োধা গাড়িগুলো পিছনে ১২জন বসার ব্যাবস্থা নিয়ে এই পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে চলে, ঐগুলোই চান্দের গাড়ি নামে পরিচিত। ড্রাইভারকে ফোন দেয়া শেষ হলে আমরা সকালের নাস্তা করতে বসি। নাস্তা শেষ করতে করতেই চলে এসেছেন ড্রাইভার মিঃ চাপাই। আজ বিকেল পর্যন্ত আমরা খাগড়াছড়ি ঘুরে দেখবো। তারপর বিকেলের এস্কোর্ট নিয়ে যাবো সাজেক। উল্লেখ্য, সাজেক যেতে হলে সকালে অথবা বিকেলে নির্দিষ্ট সময়ে আর্মি এস্কোর্টের সাথে যেতে হয়, নিরাপত্তাজনিত কারনেই এটা আসলে করা হয়। শুরু হলো খাগড়াছড়ি ঘুরাঘুরি। গেলাম আলুটিলা গুহাতে।

বেশ ঘুটঘুটে অন্ধকার, মশাল নিয়ে যায় সবাই। ১০টাকা করে নেয় মশাল। যদিও ভরসা মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইটে, গুহার অপর প্রান্ত দিয়ে বের হয়ে দেখা যায়, গুহার ভেতর দিয়ে যে পানি আসছে সেটা আর্টিফিশিয়াল, আর গুহার ভেতরটাও বেশ পিচ্ছি এই পানির কারনে।

আলুটিলা গুহা ঘুরে এসে একটা হ্যালিপেডে গেলাম, এখান থেকে বেশ ভালো একটা ভিউ পাওয়া যায়। উঁচু থেকে এমন ভিউ দেখলে আসলে বেশ ভালোই লাগে।


কিছুক্ষন আড্ডা দিয়ে, ফিরে এলাম আবার আগের জায়গায় যেখান থেকে শুরু হয়েছিলো চান্দের গাড়ীর প্রথম যাত্রা। এখানে ব্যাম্বো শুট নামের একটা রেস্তোরায় লাঞ্চ সেড়ে নিলাম। মাশরুমের ভাঁজি (আমার খেয়ে মনে হয়েছে বেষ্ট খাবার), কাকড়া ভূনা, ডাক কারি, আর ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে নিলাম সবাই। লাঞ্চ শেষে রওনা দিলাম হাজাছড়া ঝর্ণার উদ্দেশ্যে। যেদিকেই ঘুরিফিরি ভালো লাগে। সবদিকেই পাহাড়ি রাস্তা। হাজাছড়া ঝর্ণার কাছে এসে জামা কাপড় বদলে নিলাম। বর্ষা মৌসুমে অথবা বৃষ্টির পর পর আসলে ঝর্ণার সৌন্দর্য্য বেশী উপভোগ করা যায়।


সম্ভবত কয়েকদিন আগে বৃষ্টি হয়েছে এই দিকে তাই ঝর্ণার পানির প্রবাহ খুব বেশী না হলেও মোটামুটি রয়েছে। পা ভিজাতেই সারা শরীর নাড়া দিয়ে উঠলো। অত্যন্ত ঠান্ডা পানি। এদিক সেদিক দেরী না করে ভিজাভিজি খেলে নিলাম কিছুক্ষন। এই অবস্থায়ই গায়ে কাপড় শুকাতে শুকাতে আর চিল্লাচিল্লি করে গান গাইতে গাইতে চান্দের গাড়িতে করে রওনা দিলাম এস্কোর্টের সাথে। গন্তব্য সাজেক।

সাজেক ভ্যালী মানুষের কতটা ভালো লাগে জানিনা, তবে সাজেক যাওয়ার রাস্তাটা ব্যাপক। যতটা সুন্দর ততটাই ভয়ংকর। কখনও ৬০ ডিগ্রি নেমে যেতে হয় তো কখনও ৭০ডিগ্রি খাড়া উঠতে হয়। একটু অন্যমনস্ক হলে কাজ শেষ অবস্থা একদম। সত্যিই মনের মধ্যে একটু ভয় কাজ করলেও আনন্দটা উপভোগ করার মত। বিকেল ৫টা ২০মিনিটের দিকে সাজেক গিয়ে পৌছাই। আগে থেকে বুক করে রাখা রিসোর্টে সবাই তরিঘরি করে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে পরে সূর্যাস্ত দেখতে যাবে হ্যালিপেড থেকে। এখানে বেশ কয়েকটা হ্যালিপেড আছে। উপরে বসে থাকতে বেশ ভালো লাগে।

পুরো সাজেক ভ্যালী আসলে রাঙামাটি রুইলুই পাড়া পাহাড়ের উপরে। যেদিকেই তাকাই সব কিছু এত্তো নীচে দেখা যায়। মেঘের উপরে আছি আমি। মেঘগুলো সব নীচ দিয়ে চলাচল করছে। তাই সাজেককে মেঘের স্বর্গরাজ্যও বলে অনেকে। অন্ধকার নেমে এলে সবাই রিসোর্টে ফিরে এলাম চা খেয়ে। শুরু হলো আড্ডা, কার্ড খেলা। আড্ডা শেষে রাতের ডিনার সেড়ে আবার গন্তব্য হেলিপ্যাড। বলে রাখা ভালো খাবার আগে থেকে অর্ডার করে রাখতে হয়। ব্যাম্বো চিকেন (বাঁশের ভিতরে মুরগী রান্না), ভর্তা, ডাল দিতে ভাত খেয়েছি সবাই। বসে আছি হ্যালিপেডে চাঁদের সাথে মেঘের খেলা, চলছে পোর্টেবল স্পীকারে গান, চলছে আড্ডা, হাসিতামাশা। রাত বেড়ে গেলে চলে আসি আবার রিসোর্টে, এবার একটু বিশ্রামের পালা। এখানে সাজেকের চেয়ে উচু পাহাড়ও আছে, ওটা কংলাক পাড়ায়। আগামীকাল সারাদিন এদিকেই ঘুরবো, তারপর বিকেলের এস্কোর্টে আবার খাগড়াছড়ি চলে যাবো।
২রা মেঃ নাস্তা খেতে হলে সবাইকে অবশ্যই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে। সকাল বলতে সর্বোচ্চ ৯টা। আমাদের অনেকেই সকালে সূর্যোদয় দেখে ঘুমিয়েছে, তাই উঠতে উঠতে বেলা ১০টা। নাস্তা খেলাম লুচি-ডাল, রস পুরী (আটা দিয়ে করা এক ধরনের পিঠার মত, মিষ্টির শিরায় ডুবিয়ে তৈরী করে), সিঙ্গারা। খাওয়া শেষে তৈরী হয়ে নিলাম। প্রচন্ড রোদ মাথায় চান্দের গাড়ী নিয়ে রওনা দিলাম কংলাক পাড়ার দিকে। বেশ খাড়া পাহাড় প্রায় ৮০ ডিগ্রির চেয়েও বেশী খাড়া হেটে উঠতে হয়। গাড়ি অনেক আগেই আপনাকে নামিয়ে দিবে। ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ একদমই করা হয়না, পাহাড় চড়তে গিয়ে বুঝা যাচ্ছে বেশ। কষ্ট করে যতদূর দেখা যায় উঠলাম, উঠে একটি বাঁক পেরোতেই দেখি, যেটা উঠেছি তার চেয়ে বেশী খাড়া এবং যতটুকু উঠেছি ঠিক অতটূকু জায়গার মতই দূরত্ব আরও উঠতে হবে!! ওহ, নীচ থেকে সবাই ১০টাকা করে বাঁশ নিয়ে এসেছি। বড়ই উপকারি জিনিস। পায়ের উপর প্রেসার কমায়। কোন রকম উঠলাম উপর থেকে। ওয়াও!! এক কথায় ওয়াও! অসম্ভব সুন্দর দেখতে এখান থেকে সব। এখানেও মানুষ বাস করে। উনারা যেভাবে নিজেদের পানি এবং খাবার উপরে নিয়ে আসেন দেখতেই কষ্ট লাগে। একটি বাঁশের শেড করা মাচাতে বসে সবাই বিশ্রামের সহিত উপভোগ করলাম মুহূর্ত ।

বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে, আমাদের ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করে রওনা হতে হবে। আস্তে আস্তে নামা শুরু করলাম। নেমে গিয়ে গাড়ীতে উঠলাম। ফিরে গেলাম রিসোর্টের ওখানে। ফ্রেশ হয়ে তৈরী হয়ে নিলাম একবারে সবাই, খেয়েই রওনা দিবো। সাড়ে ৩টার দিকে এস্কোর্ট ছাড়বে। ব্রয়লার মুরগী, ডাল, শাক, ভাঁজি দিয়ে ভাত খেয়ে নিলাম। মুরগীর রান্নাটা অসাধারণ ছিলো। মুরগী আমার বরাবরের ন্যায় অপছন্দ, আমি যে অফিসে চাকুরী করি ঐখানে সপ্তাহের বলা চলে সাতদিনই মুরগী খাওয়ায়। যাইহোক, খাওয়া শেষে চা খাওয়ার সময় হলোনা তাই চা নিয়েই চান্দের গাড়ীতে সবাই। আবার সেই ৬০ডিগ্রি, ৭০ডিগ্রি উঁচুনিচু রাস্তা পেরিয়ে উপভোগ করতে করতে খাগড়াছড়ি আসতে আসতে সন্ধ্যা প্রায়। এখানে এসে হোটেল নিয়ে নিলাম একটা। আরেক টীম চলে গেলো বাসটার্মিনাল, আগামীকাল সকালে আমাদের গন্তব্য রাঙামাটি। হোটেলে উঠে সবাই ফ্রেশ হয়ে বের হতে হতে আবার দেরী। এইদিকে (খাগড়াছড়ি) ৮টা মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে সবাই ঘুমিয়ে পরে অবস্থা, ৯টা বেজে যাওয়ায় একটু বিপাকে পরতে হলো। অটো নিয়ে শহর অর্ধেক ঘুরে পরে একটা ভাতের হোটেল গেলাম, গিয়ে ভাত খেয়ে নিলাম, ভর্তা, ডাল, গরুর মাংশ, মাছ দিয়ে। খেয়ে হোটেলে ফিরে এসে শুরু আবার আড্ডা। খাগড়াছড়ি শহরটায় রাত একটু আগেই হয়ে যায় মনে হয়। আকাশটা বেশ খারাপ করেছে। বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে, বাতাস বইছে। রাত বেড়ে এলে ঘুমিয়ে পরলাম সবাই, সকাল ৮টা ২৫মিনিটের বাস রাঙামাটি যাওয়ার।
৩রা মেঃ সকাল ৭টা ১৫মিনিটে ঘুম থেকে উঠেই তরিঘরি শুরু সবার। ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি রওনা দিতে দিতে এই লেইট লতিফদের আর নাস্তা করা হয়নাই। গিয়ে বাস ধরতে পেরেছি এইটাই অনেক। এবার যাচ্ছি রাঙামাটি। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা। কখনও উঁচু তো আবার কখনও নিচু। বেলা ১২টা নাগাদ আমরা রাঙামাটি পৌছে যাই। নেমেই আগে ফ্রেশ হয়ে কিছু নাস্তা খেয়ে নেই সবাই। এবার নৌকা ভাড়া করতে হবে। আজকের প্ল্যান, নৌকা নিয়ে কাপ্তাই লেকে ঘুড়বো সন্ধ্যা পর্যন্ত। ঝুলন্ত ব্রীজ, ঝর্ণা, এসব দেখতে দেখতে লেকেই কাটাবো সারাটা দিন। কাছেই নৌকা ঘাট। চা খেয়ে হাটা দিলাম ঘাটের দিকে। একইরকম দেখতে অনেক নৌকা, কিছু নৌকার ছাদের উপরেও চেয়ার বসানো আছে বসার জন্য। আমরা ঠিক এমনই একটা নৌকা নিলাম যেটার উপরে বসা যাবে।

নৌকা ভাড়া করার পর, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে নিলাম। নিয়ে যাত্রা শুরু। বড় বড় পাহাড়, তার মাঝে দিয়ে বয়ে চলা লেক। কাপ্তাই লেকের কথা শুনেছি ছোটকালেই কিন্তু আসা হয়নি। অন্যরকম সুন্দর। আঁকাবাঁকা লেকের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা আমাদের নৌকা।

ঝুলন্ত ব্রীজ দেখে শুভলং ঝর্নায় গেলাম, পানি নেই। মাঝখানে একটা পাহাড়ে থামালো, এখানে দুপুরের খাবার খেয়ে নেয়া যায়। রেস্তোরার নাম “প্যাদা টিং টিং” । দুপুরে খাওয়ার তেমন ইচ্ছে নেই, তবে কেউ চাইলে এখানেও পাহাড়ি খাবার খেয়ে নিতে পারে, যেমনঃ ব্যাম্বো চিকেন ইত্যাদি। আমার বান্ধুবীর ব্যাঙ খাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিলো, পায় নাই। বড় বড় ডাব দেখে আর নিজেদের সামলাতে পারিনাই। ৩০টাকা থেকে ৫০টাকা পর্যন্ত দাম। ইচ্ছেমত ডাব খেয়ে নিলাম সবাই। আবার নৌকায় উঠে পরলাম। জিজ্ঞাসা করলাম আশেপাশে পানি পরে এমন ঝর্ণা নেই, ওখানে নিয়ে যান। নিয়ে গেলো একটা ঝর্ণা কাছে, কি আর বলবো ক্যামন যে পানি পরে। আকাশ বেশ মেঘলা।

শুরু হলো হালকা বৃষ্টি। আমরা একটা পাহাড়ে চড়ছিলাম, নেমে গেলাম তাড়াতাড়ি, নামতে গিয়েও বিপদ, আমাদের কয়েকজন জানে বেঁচে গেছে পড়তে পড়তে। বৃষ্টি থেমে গেলো, ভেজা শরীরে বাতাস খেতে খেতে রওনা দিলাম। একটা টেম্পল পরে মাঝপথে, যেতে আসতে উভয় সময়ই, বুদ্ধদের মন্দির।

এখানে নেমে ফ্রেশ হয়ে নিলো সবাই, চা খেয়ে নিলাম, লিচু কিনলাম ১০০টাকায় ১শ। লিচু খেতে খেতে আবার নৌকা ঘাটে ফেরার পালা। মাঝপথে সূর্যাস্ত দেখা জন্য ১০ মিনিটের বিরতি (ইঞ্জিন বন্ধ)। কোথাও কোন শব্দ নেই, মাঝে মাঝে পাখিদের শব্দ শুনতে পাই।

নৌকা ঘাটে পৌছে তাড়াতাড়ি রওনা দিলাম বাস স্ট্যান্ডের দিকে, ততক্ষনে ৭টা বাজলো বলে। দেরী হলে আর চট্টগ্রাম যাওয়ার বাস পাওয়া যাবেনা। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য চট্টগ্রাম, ওখানে রাতে থাকবো। ঠিকই দেরী হয়ে গেছে, সর্বশেষ গাড়িগুলো পেলেও, ১০জনের সীট আর পাওয়া গেলোনা। পরে সি.এন.জি করে ভেদভেদী বাজার গেলাম। ওখান থেকে সি.এন.জিতে করে চট্টগ্রাম যাওয়া যাবে। ৮০০টাকা করে পরে একেকটা সি.এন.জি। নিয়ে নিলাম ২টা সি.এন.জি। এসে যখন চট্টগ্রাম পৌছলাম তখন রাত ১০টা বেজে গেছে। এখান থেকে পুরাতন রেলস্টেশন যাবো, ঐখানে হোটেল এভেইলেভিলিটি বেশী। হোটেলে গিয়ে চেক-ইন করতে করতে ১১টা ৩০ বেজে গেছে। ফ্রেশ হয়ে বের হলাম সবাই, রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। তারপর হোটেলে ফিরে ঘুম, আগামী সকালে গন্তব্য কাপ্তাই। কর্ণফুলী নদীতে কায়াকিং করবো।
৪ঠা মেঃ বেশ কাহিল সবাই। উঠতে উঠতেই সকাল ১০টা। রাতে আড্ডা দেয়া হয়েছে অনেক রাত পর্যন্ত, তাই বিশ্রাম না নিয়ে সকালে বের হওয়া কঠিন হয়ে যাবে। তাই দেরী করে উঠা। দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে গেলাম আমরা। ৫জন যাবো কাপ্তাই আর ৫জন ঘুরবে চট্টগ্রাম। আমি কাপ্তাই টিমের সাথে। নাস্তা শেষে রওনা দিলাম ১২টার আগে দিয়ে। এখানে থেকে লোকাল বাসে করে বহদ্দার হাট যাচ্ছি, ভাড়া ১০টাকা জনপ্রতি। চট্টগ্রাম শহর আর আগের মত নেই। প্রচুর জ্যাম, রাস্তার কাজের জন্য আরও বাজে অবস্থা। ১২টা ৪৫এর দিকে বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল পৌছলাম, এখান থেকে কাপ্তাই-এর বাস যায়। “কাপ্তাই জুম রেস্তোরা” – বললে নামিয়ে দিবে, ভাড়া ৬৫টাকা জনপ্রতি।

বেলা তিনটার দিকে পৌছলাম জুম রেস্তোরায়, গিয়ে পুরো বিপাকে। আজ শুক্রবার দিন। কায়াক বোট পাওয়াই যাচ্ছেনা। একটা কায়াক বোটে ২জন বসতে পারে। আমরা ৫জন, আমাদের তিনটা বোট লাগবে। ৪টা ৩০ এর দিকে ২টা বোট পেলাম। ১ঘন্টা ২০০টাকা করে প্রতি বোট, আর রেস্তোরায় ঢুকতে ২০টাকা। আমাদের একজন অপেক্ষমান রইলো। বিশাল উঁচু পাহাড়ের মাঝদিয়ে কর্ণফুলী নদী, তার উপর আপনি বসে আছেন একদম পানির লেভেলে।

বৈঠা দিয়ে পানিতে ধাক্কা দিতেই সাই সাঁই চলে কায়াক বোট। লাইফ জ্যাকেট পরে নিয়েছি। এইসব বোট উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে অনেক। আকাশ মেঘলা, আপনার সবদিকে পাহাড়, মাঝখানে কায়াক বোটে বসে একটু একটু করে আগাচ্ছে, বেশ চমৎকার অনুভুতি। ফিরে আসলাম সহি সালাহ মতেই।

জুম রেস্তোরার ভেতর বসে আছি, নেমেছে ঝুম বৃষ্টি। নাস্তা অর্ডার করলাম। আমাদের আবার একটু তাড়াও আছে, ৬টা অলরেডি বাজে। আমাদের আজ রাত ১১টায় ঢাকা ফিরার ট্রেন। ৬টা ৩০ এর দিকে নাস্তা শেষ করে লোকাল সি.এন.জিতে করে লিচু বাগান গেলাম ২০টাকা জনপ্রতি। ঐখান থেকে জনপ্রতি ৭০টাকা করে নিবে চট্টগ্রাম কাপ্তাই রাস্তার মাথা (এইটা একটা জায়গার নাম) । সি.এন.জি নেয়ার উদ্দেশ্য একটু তাড়াতাড়ি যাওয়া। গতকালের মতই জার্নি। ৮টার কিছুক্ষন পরে এসে পৌছলাম কাপ্তাই রাস্তার মাথায়। এখান থেকে আবার লোকাল বাসে জার্নি করবো, রেলস্টেশন যেতে হবে। এইবার ঠিকমত জ্যামে পরলাম, রেলস্টেশন পৌছতে পৌছতে আমাদের ৯টা ৩০এর উপরে বেজে গেছে। গিয়েই রাতের খাবার খেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আমাদের বাকী টিম মেম্বারদের সাথে দেখা করে সবাই ট্রেনে উঠে পরলাম। ১১টায় ট্রেন ছেড়ে দিলো। ট্রেনের সীটে বসেই সবাই ঘুম। রাত জেগে ব্যাগ পাহারা দিলাম। যেকোন ট্যুর থেকে ফিরতেই আমার বেশ খারাপ লাগে। মনে পরে যায়, আবার সেই ঢাকা ফিরে যাচ্ছি, আবার সেই কাজকর্ম আমার। আবার ব্যাস্ত হয়ে যাওয়া। সকাল ৫টা নাগাদ পৌছলাম ঢাকা। সবাইকে বিদায় দিয়ে বাসায় চলে আসলাম। একটু ঘুমিয়ে আবার অফিসে চলে গেলাম।
মনে রাখার মুহূর্তঃ
১. যখন প্রথম ঢুকি খাগড়াছড়ি বাসে করে, বাসের সেই টার্ন নেয়া গুলো।
২. যখন সাজেকে রাতে হ্যালিপেডে বসে আকাশে মেঘে আর চাঁদের খেলা দেখি।
৩. সাজেকের রাস্তায় সেই খাঁড়া পাহাড় বেয়ে গাড়ির উঠানামা।
৪. কংলাক পাহাড় বেয়ে উঠা।
৫. খাগড়াছড়ি থেকে রাঙ্গামাটির সেই রাস্তা।
৬. নৌকায় করে কাপ্তাই ঘুরাঘুরি। বিশেষ করে সেই ১০মিনিটের স্তব্ধতা।
৭. অনন্তকালের সি.এন.জি জার্নি। যেন চলছে তো চলছেই। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তায়।
৮. কর্ণফুলী নদীতে কাটানো কায়াকিং-এ এক ঘন্টা।
৯. ট্রেনে রাত জেগে ঠান্ডা বাতাসে চাঁদ দেখা।