A common place where I can share my thoughts, knowledges to the world.
জীবনের প্রথম বাইসাইকেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ
বিডিসাইক্লিস্টস স্বাধীনতা দিবস রাইড – ২০১৯
আজ ২৩ শে সেপ্টেম্বর ২০১৯, গল্পটা শুরু হয়েছিলো যদিও অনেক আগে কিন্তু তিন বছর আগে তা নতুন মোড় নেয়। বিডিসাইক্লিস্টের হ্যাশট্যাগ চ্যালেঞ্জ -এ লেখা আমার গল্পটি হুবুহু তুলে ধরা হলো সবার জন্য-
চতুর্থ শ্রেণীতে থাকতেই সাইকেলের বেশ শখ ছিল আমার, যদিও আমি সাইকেল চালাইতে পারিনা। কিন্তু পরিবারের মোট আয় তখন সংসার অতিরিক্ত খরচ সাপোর্ট করতোনা। তাই বাবার কাছে অনেক অনুরোধ করেও একটি সাইকেল পেলাম না। ছোট মানুষ আমি, কেনো বাবা সাইকেল কিনে দিল না তা বুঝতে পারিনি তখন।
একই বছর, সারা বছরের সকল মেয়াদী পরীক্ষা মিলে যদি প্রথম হতে পারি তাহলে আমার মেঝো চাচা সাইকেল কিনে দিবেন বললেন। যখন ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট হাতে আসে তখন আমি দ্বিতীয় হয়েছি, প্রথম না হওয়ায় তাই সাইকেল আর ভাগ্যে জুটলোনা।
যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পরি তখন আবার মেঝো চাচা সাইকেল কিনে দিবার একটা সম্ভাবনা তৈরী হলো, কিন্তু উনার ব্যাবসা ভালো না চলায় সেবারও সাইকেল পেলাম না।
যখন অষ্টম শ্রেণীতে উঠলাম তখন আমার এক মামা আমার ছোট ভাইকে একটি সাইকেল কিনে দিলেন। সাইকেলটি আমার তুলনায় ছোট, চালাতে গেলে পায়ে হ্যান্ডেলবার লেগে যাওয়ার মতো ছোট। সেই সাইকেলেই ছাদে সাইকেল চালানো শেখা। ত্রিশ মিনিটের মতো সময় লেগেছিলো। সে বছরই খুব ভালো একজন বন্ধু হয় আমার স্কুলে (যে আজ আমার ক্লোজ ফ্রেন্ড)। আমার বন্ধুর নাম রাফি। রাফির একটা সাইকেল ছিল। সেই সাইকেলেই তখন ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতাম। সাইকেল নিয়ে রাস্তায় উল্টে পরে গেলে রাফি আগে সাইকেল না দেখে খেয়াল করতো আমার কিছু হয়েছে কিনা। বেশ ভালো সময় ছিল। বেশ কিছু বাজে এক্সিডেন্টও করেছি। তারপর আমরা এসএসসি পাশ করার পরে আমাদের দুইজনের কারোরই আর সাইকেল চালানোর সুযোগ হয়নি। আর আমার নিজের জন্য একটি সাইকেলও কেনা হয়নি।
মধ্যবিত্ত পরিবারে কখনো হুট করে চাইলেই কিছু কিনে ফেলা যায়না, আর এটাই ছিল আমার সাইকেল কেনার ইচ্ছার জন্য তালাবদ্ধ শিকল।
এভাবে কেটে গেলো আরও আট বছর। আমার গ্র্যাজুয়েশন শেষ। দেশের ভালো একটি সফটওয়্যার কোম্পানীতে আমি জুনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার (বেতনঃ ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটের বেতন পয়সাতে দেয় টাকাতে দেয়না টাইপ) । ইউনিভার্সিটিতে থাকতে আমাদের কো-অর্ডিনেটর, চেয়ারম্যান স্যার সহ স্টুডেন্ট টিচার্স মিটিং-এ আমরা বহুবার বলেছি আমাদের নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের এখান থেকে পাশ করার পরে এখানে শিক্ষকতার বিষয়ে। অবশেষে তা বাস্তবায়ন হলো। এবং কল আসলো আমার কাছে খন্ড কালীন শিক্ষক হিসেবে জয়েন করার জন্য। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার বিষয়টা একদম স্বপ্নের মতো। আমার তখন মাত্র প্রভিশন পিরিয়ড শেষ হলো চাকুরীতে। প্রভিশন পিরিয়ড তিন মাস। অর্থাৎ, তিন মাস মনিটরিং-এ রাখা হয়। আমি ঠিকমত কাজ করছি কিনা, পাংচুয়াল কিনা ইত্যাদি দেখে। মাত্র প্রভিশন পিরিয়ড শেষ হলো, এর মাঝে এখনই এমন একটি অফার। সবকিছু কেমন গোলমেলে।
আমি এবং আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার মাঝে পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় সময়। আমার অফিস শুরু সকাল ১০টায়, আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি নেয়ার মতো ক্লাস টাইম অনলি একটা ৮ঃ৩০ মিনিট থেকে ৯ঃ৫০মিনিট। অর্থাৎ হাতে থাকে ১০ মিনিট। বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস নিতে হবে বনানীতে এবং অফিস নিকেতন(গুলশান)। অফিসে দেড়িতে ঢুকলে সেলারী কাঁটা মাস্ট। এবং আমার তখন যা সেলারী তা দিয়ে নিজের মাসিক হাত খরচই ঠিকমতো চলেনা। তার উপর সেলারী কাঁটা গেলে আমার তখন বাসা থেকে টাকা নিতে হবে। ইউনিভার্সিটি থেকে কল পাওয়ার পরদিনই আমি আমার সুপিরিয়রের সাথে আলোচনা করি। তাকে জানাই আমার বিষয়টি। সে খুব খুশি হয়, এবং আশ্বস্ত করে আমাকে আমি খুব ভালো সুযোগ পেয়েছি। আমি উনার কাছে বলেছিলাম ২০ মিনিট দেড়িতে অফিসে আসতে চাই, এইটা অথরিটিকে কোনোভাবে মানানো যাবে কিনা। উনি অথরিটির কাছে আমার বিষয়টি বললেন এবং উপর থেকে ডিরেক্ট অর্ডার আসলো এটা সম্ভব নয়।
মন খারাপ হয়ে গেলেও হাল ছাড়িনি। রাতে বন্ধু রাফির সাথে বসে বসে কথা বলছিলাম। একটা প্ল্যান বানালাম এবং বন্ধুর সাথে শেয়ার করলাম। আমি একটা সাইকেল কিনবো। অফিসের দূরত্ব ৩.৮ কিলোমিটারের মতো। এই দূরত্ব আমি শুধু মাত্র সাইকেলে পারি দিয়েই অফিস সময়মতো ঢুকতে পারবো। বেশ কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল, কারণ আমি গত ৮ বছর ধরে সাইকেলের সাথে নাই। আদোও ঠিকমতো চালাতে পারবো কিনা, তার উপর সময় হিসেবে করে চালাতে হবে, রিলাক্সে চালালেও একটা কথা ছিল। সাহস করে ইউনিভার্সিটিতে “হ্যা” বলে দিলাম, আর অফিসে আর তেমন কিছু জানাইনি। সাইকেল কেনার জন্য সাইকেল দেখলাম Nekro Zen, দাম পরবে ১৪, ৫০০ টাকা (১৫০০ টাকা ডিস্কাউন্ট চলছিলো তখন)। রাফির কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ধাঁর চাইলাম। বাসা থেকে বাকি টাকা ধাঁর নিলাম। সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৬ (শুক্রবার) গিয়ে সাইকেল কিনলাম ধানমন্ডি লায়ন্স সাইকেল স্টোর থেকে, বন্ধু হিমেল (আমার আরেক ক্লোজ ফ্রেন্ড)-কে সাথে নিয়ে গিয়ে। প্ল্যান অনুযায়ী ২৪ শে সেপ্টেম্বর শনিবার দিন দিবো ট্রায়াল রান। শনিবার থেকে বুধবার আমার অফিস ডে। তাই শনিবার দিন অফিস যাতায়াতে আমি একটি ধারণা পাবো সময়ের (কারণ বাসাও বনানী আর বিশ্ববিদ্যালয়ও বনানী)। শুক্রবার দিন সাইকেল কিনে ধানমন্ডি থেকে একাই বনানী (আমার বাসা) ফিরে আসলাম। ত্রিশ মিনিট সময় লাগলো, মনে বেশ খুশি লাগছিলো। পরের দিন ট্রায়াল রান দিলাম, অফিসে গেলাম, সময় লাগলো ১২ মিনিট। এবার ফাইনাল খেলা।
Nekro Zen (2015)
একটি কোর্স পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তাহলে সপ্তাহে ২দিন সকালে ক্লাস থাকবে এবং মাসে ৮দিন। সব চিন্তা করে নিলাম, যদি প্ল্যান ওয়ার্কআউট না করে যাতে আমার লসের পরিমান অন্তত কম থাকে। যদিও আমি দুইটি কোর্স নিতে পারতাম অফিসিয়ালি, সেক্ষেত্রে আমার সপ্তাহে ৪দিন সকালে ক্লাস এবং মাসে ১৬ দিন(!) রিস্ক অনেক বেশী হয়ে যায় শুরুতেই। তাই চিন্তা করলাম সপ্তাহে দুইদিনই ঠিক আছে। এই সেমিস্টারে যদি প্ল্যান ওয়ার্ক করে তাহলে পরের সেমিস্টারে দুটি কোর্সই পড়াবো। প্রথম দিন ক্লাসে গেলাম, ঝামেলা বাধলো পার্কিং নিয়ে। সাইকেল কোথায় রাখবো। Nekro Zen কমিউটার বাইক, ওজনে ১১কেজি। যে কেউ নিয়ে হাটা দিতে পারে। দারোয়ানকে বলে ক্লাস নিতে চলে গেলাম। ক্লাস দশ মিনিট আগে ছেড়ে দিলাম। অফিস এসে পৌছলাম ১০ টার আগেই! ১৫ মিনিটের মধ্যে চলে এসেছি! রাস্তায় ট্রাফিক বেশী থাকলে দ্রুত চালানো যায়না, আর একটু পর পর ব্রেক করলে গতি কমে যায়। আমার খুশি আর দেখে কে, প্ল্যান ইজ ওয়ার্কিং। প্রথন দিন দারোয়ানকে বলে কয়ে সাইকেল রেখে ক্লাসে যাওয়ার পরে, দ্বিতীয় দিন ক্লাসে যখন যাবো তখন দারোয়ান রাখতে রাজি হয়না। পরে ইউনিভার্সিটি স্টাফদের ডেকে এনে রাখলাম কোনো রকম। যেই বিল্ডিং-এ ক্লাস নিচ্ছি এটা ইউনিভার্সিটির সম্পুর্ন নিজেদের নেয়া বিল্ডিং নয়, শেয়ার্ড, তাই এতো ঝামেলা। সেদিন ক্লাস নিয়ে অফিসে আসার পরে মাথা গরম। সাইকেল ঠিকমত পার্ক করতে না পারলে শান্তিতে ক্লাস নিতে পারিনা, আবার বাসায় রেখে ভার্সিটি গেলেও আবার বাসা থেকে এসে সাইকেল নিয়ে বের হতে হতে ১০মিনিট এক্সট্রা লেগে যাবে। পরে ইউনিভার্সিটিতে আমার মেন্টর, কোর্স কো-অর্ডিনেটরের কাছে আমি সহযোগিতা চাই। তিনি সহযোগিতা করেন এবং আমি সেন্ট্রাল বিল্ডিং-এ পার্ক করে ক্লাস নিতে লাগলাম। এভাবে এক সেমিস্টার অতিবাহিত হওয়ার পর আমি পরের সেমিস্টারের দুটি কোর্স নিলাম পাশাপাশি রাফি এবং বাসা থেকে নেয়া টাকা শোধ করে দিলাম।
এই নিয়ে ৯ সেমিস্টার পড়ানো শেষ করলাম গতকাল (আলহামদুলিল্লাহ) । ৩ বছর! সেই সময়ের সেই সাহস, কনফিডেন্স, প্ল্যান, আর কেনা সাইকেলটাই আমাকে এতো দূর নিয়ে এসেছে। নতুন চাকুরী ছিল, চাকুরীটা চলে যেতে পারতো। অথবা চাকুরী ধরে রাখতে চাইলে শিক্ষকতার সেই স্বপ্নটাও হয়তো পূরণ হতোনা। আর সাইকেল থাকাতে আমি বিডিসাইক্লিটস জয়েন করতে পেরেছি, পেরেছি #Lokkhojokhonek#300BikeFriday#BDCVictoryDayChallenge সহ #VictoryDayRide#BikeFriday তে অংশগ্রহন করার সুযোগ।
আমার বাংলা বানান ভূল মার্জনীয় দৃষ্টিতে দেখবেন আশাকরি।
সবাই হেলমেট ব্যাবহার করবেন। নিরাপদে সাইক্লিং করবেন। আমার নিজের হেলমেট ছিলনা, ২০১৬ সালেই আমাকে এক বন্ধু ন্যায় ছোট ভাই (পাপিন) একটি হেলমেট দিয়েছে ব্যাবহার করার জন্য, আমি এখনও ওটাই ব্যাবহার করছি, ইনশাআল্লাহ এই মাসে একটা নতুন হেলমেট কিনবো।